মূল অংশে যান
← সব লেখা

সুশাসন

স্বার্থের দ্বন্দ্ব: সমিতির কমিটিতে কীভাবে চিনবেন, ঘোষণা দেবেন ও এড়াবেন

কমিটির সদস্যের আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান কাজ পেলে বা নিজের বকেয়া মওকুফের সিদ্ধান্তে তিনি থাকলে কী করবেন — স্বার্থের দ্বন্দ্ব চেনা, ঘোষণা ও নীতিমালার সহজ পদ্ধতি।

১১ অক্টোবর ২০২৬ ৫ মিনিটে পড়ুন

· সোসাইটি কিপার টিম
স্বার্থের দ্বন্দ্ব: সমিতির কমিটিতে কীভাবে চিনবেন, ঘোষণা দেবেন ও এড়াবেন

কমিটির এক সদস্যের ভাগনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রং করার কাজ পেল। কাজ হয়তো ভালোই হয়েছে, দামও হয়তো ঠিক ছিল — কিন্তু সদস্যদের মনে সন্দেহ থেকেই গেল। স্বার্থের দ্বন্দ্ব (conflict of interest) মানেই দুর্নীতি নয়, কিন্তু তা গোপন থাকলে বা নিয়ম না মানলে কমিটির প্রতি আস্থা নষ্ট হয়।

এই লেখায় দেখাব সমিতিতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব কোথায় তৈরি হয়, কীভাবে ঘোষণা দিতে হয় এবং একটি সহজ নীতিমালা কেমন হতে পারে।

স্বার্থের দ্বন্দ্ব আসলে কী

যখন কমিটির কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থ সমিতির কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মূল প্রশ্ন একটাই: এই সিদ্ধান্তে কি তাঁর বা তাঁর কাছের কারও লাভ-ক্ষতি আছে?

তিন ধরনের পরিস্থিতি মনে রাখুন:

  • প্রকৃত দ্বন্দ্ব: সদস্যের নিজের প্রতিষ্ঠান সমিতিতে সরবরাহ দিচ্ছে
  • সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব: আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে চায়
  • দৃশ্যমান দ্বন্দ্ব: বাস্তবে লাভ না থাকলেও বাইরে থেকে সন্দেহজনক দেখায়

সমিতিতে কোথায় দ্বন্দ্ব বেশি দেখা দেয়

  1. কেনাকাটা ও ঠিকাদারি: নিরাপত্তা সংস্থা, পরিচ্ছন্নতা, মেরামত, রং, সিসি ক্যামেরা
  2. কর্মী নিয়োগ: কমিটির সদস্যের পরিচিত বা আত্মীয়কে চাকরি দেওয়া
  3. নিজের বকেয়া বা জরিমানা: নিজের ফ্ল্যাটের বিলম্ব ফি মওকুফের সিদ্ধান্তে নিজেই থাকা
  4. ভাড়া ও স্থান ব্যবহার: কমিউনিটি হল বা ছাদ নিজের অনুষ্ঠানে কম দামে ব্যবহার
  5. আদায়কারী ও কোষাধ্যক্ষ: একই ব্যক্তি টাকা নিচ্ছেন, খাতায় লিখছেন, আবার অনুমোদনও দিচ্ছেন

ঘোষণা দেওয়ার নিয়ম

স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগে থেকে খোলাখুলি ঘোষণা। দুটি পর্যায়ে ঘোষণা নিন:

বার্ষিক ঘোষণা

দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রত্যেক কমিটি সদস্য একটি ফর্মে লিখবেন — তাঁর বা পরিবারের কোনো ব্যবসা সমিতির সঙ্গে লেনদেন করে বা করতে পারে কি না। নমুনা ঘোষণা:

"আমি, …… (পদবি), ঘোষণা করছি যে আমার/আমার পরিবারের সদস্যের মালিকানাধীন বা আমি যুক্ত আছি এমন নিম্নলিখিত প্রতিষ্ঠান সমিতির সঙ্গে লেনদেন করতে পারে: ……। নতুন কোনো স্বার্থ তৈরি হলে আমি দ্রুত কমিটিকে লিখিতভাবে জানাব।"

সভায় তাৎক্ষণিক ঘোষণা

কোনো আলোচ্যসূচিতে নিজের স্বার্থ থাকলে সদস্য আলোচনা শুরুর আগেই বলবেন এবং সেই বিষয়ের আলোচনা ও সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকবেন। কার্যবিবরণীতে লিখুন: "আলোচ্যসূচি ৪-এ জনাব …… স্বার্থসংশ্লিষ্টতা ঘোষণা করে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকেন।"

একটি সহজ নীতিমালার কাঠামো

কমিটি সভায় নিচের বিষয়গুলো নিয়ে একটি এক পাতার নীতিমালা পাস করতে পারেন:

বিষয় প্রস্তাবিত নিয়ম
ঘোষণা প্রতি বছর লিখিত ঘোষণা; নতুন স্বার্থ হলে সঙ্গে সঙ্গে
সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকা স্বার্থসংশ্লিষ্ট সদস্য আলোচনা ও ভোটে অংশ নেবেন না
কেনাকাটা নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি হলে একাধিক কোটেশন বাধ্যতামূলক
নিজের বিল নিজের বকেয়া বা জরিমানা মওকুফে নিজে অনুমোদন দেবেন না
উপহার সরবরাহকারীর কাছ থেকে ব্যক্তিগত উপহার গ্রহণ নয়
রেকর্ড সব ঘোষণা একটি রেজিস্টারে সংরক্ষণ

আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়া নিষিদ্ধ করার দরকার নেই — অনেক সময় সেটাই সেরা দর হতে পারে। দরকার শুধু ঘোষণা, স্বার্থসংশ্লিষ্ট সদস্যকে বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত, আর তুলনামূলক কোটেশনের রেকর্ড। নীতিমালা গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক যেন না হয়, তা মিলিয়ে নিন।

টিপ: নীতিমালা কাগজে থাকলেই যথেষ্ট নয়। প্রতি নতুন কমিটির প্রথম সভায় এক পাতার নীতিমালাটি পড়ে শোনান এবং ঘোষণা ফর্ম পূরণ করান।

কেউ ঘোষণা না দিলে কী করবেন

পরে যদি জানা যায় কোনো সদস্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব গোপন রেখেছিলেন, তখন রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত না নিয়ে একটি ধাপে ধাপে পথ অনুসরণ করুন:

  1. বিষয়টি পরের কমিটি সভার আলোচ্যসূচিতে আনুন
  2. সংশ্লিষ্ট সদস্যকে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দিন
  3. সংশ্লিষ্ট লেনদেনটি অন্য কাউকে দিয়ে যাচাই করান — দাম বাজারদরের সঙ্গে মিলছে কি না, কাজ ঠিকমতো হয়েছে কি না
  4. সমিতির আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকলে তা কীভাবে পূরণ হবে, সিদ্ধান্ত নিন
  5. পুরো প্রক্রিয়া কার্যবিবরণীতে লিখে রাখুন

শাস্তি বা অপসারণের প্রশ্ন এলে গঠনতন্ত্রে যা লেখা আছে, তার বাইরে যাবেন না। জটিল হলে আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

দায়িত্ব ভাগ করে ঝুঁকি কমান

অনেক দ্বন্দ্ব তৈরিই হয় কারণ একজনের হাতে সব কাজ। টাকা আদায়, খাতায় লেখা আর অনুমোদন — তিনটি আলাদা ব্যক্তির হাতে থাকলে ভুল বা অনিয়মের সুযোগ কমে, আর কাউকে অযথা সন্দেহও করতে হয় না।

একই টিমের আরও দুটি সমাধান: বড় সমবায় সমিতির জন্য সমিতি সফটওয়্যার আর ছোট সমিতি ও সঞ্চয় দলের জন্য সমিতি কিপার লাইট মোবাইল অ্যাপ।

সোসাইটি কিপার কীভাবে সাহায্য করে

সোসাইটি কিপারে রোল ও পারমিশন দিয়ে আদায়কারী, হিসাবরক্ষক ও কমিটি সদস্যের কাজ আলাদা করা যায়। কোনো বকেয়া মওকুফ বা ছাড় দিতে দ্বিতীয় একজনের অনুমোদন লাগে, তাই একজনের একার সিদ্ধান্তে কারও বিল মওকুফ হয়ে যায় না। এ ধরনের সুশাসনের আরও লেখা পড়ুন আমাদের ব্লগে।

#স্বার্থের দ্বন্দ্ব #নীতিমালা #কমিটি #স্বচ্ছতা #ক্রয়