মূল অংশে যান
← সব লেখা

অ্যাপার্টমেন্ট

অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমিতি গঠন: শুরুর দিনগুলোতে যে ১০টি কাজ জরুরি

নতুন ভবনে অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমিতি গঠন থেকে প্রথম মিটিং, ব্যাংক হিসাব, সার্ভিস চার্জ আর রেকর্ড রাখা পর্যন্ত ধাপে ধাপে একটি ব্যবহারিক চেকলিস্ট।

১১ অক্টোবর ২০২৬ ৬ মিনিটে পড়ুন

· সোসাইটি কিপার টিম
অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমিতি গঠন: শুরুর দিনগুলোতে যে ১০টি কাজ জরুরি

ফ্ল্যাট বুঝে পেয়ে সবাই উঠে গেছেন, কিন্তু লিফট কে চালাবে, দারোয়ানের বেতন কে দেবে, জেনারেটরের তেল কেনার টাকা কোথা থেকে আসবে — এসব প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই। এই শূন্যতা থেকেই বেশিরভাগ ভবনে ঝগড়া শুরু হয়। অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমিতি গঠন করে শুরুতেই কয়েকটি কাজ গুছিয়ে নিলে পরের বহু বছর ঝামেলা কম থাকে।

এই লেখায় আছে নতুন সমিতির প্রথম কয়েক মাসের একটি ব্যবহারিক কাজের তালিকা।

কেন শুরুতেই অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমিতি গঠন জরুরি

ভবনের লিফট, ছাদ, সিঁড়ি, পানির পাম্প, জেনারেটর, গাড়ি রাখার জায়গা — এগুলো সব মালিকের যৌথ সম্পদ। কারও একার দায়িত্ব নয় বলে অনেক সময় কেউই দায়িত্ব নেয় না। একটি নির্বাচিত বা মনোনীত কমিটি থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি হয়।

দেশে অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে আইন ও বিধিমালা আছে। আপনার ভবনে কোন নিয়ম প্রযোজ্য, নিবন্ধন লাগবে কি না — তা একজন আইনজীবী বা অভিজ্ঞ কারও সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ভালো। এখানে আমরা শুধু ব্যবহারিক দিকগুলো দেখব।

প্রথম সভা: কীভাবে ডাকবেন, কী আলোচনা করবেন

প্রথম সভায় সব মালিককে ডাকুন, শুধু যাঁরা ভবনে থাকেন তাঁদের নয়। বিদেশে বা অন্য শহরে থাকা মালিকদের ফোন বা মেসেজে জানান এবং প্রয়োজনে প্রতিনিধি পাঠাতে বলুন।

নোটিশের নমুনা ভাষা:

প্রিয় ফ্ল্যাট মালিকগণ, ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ও মালিক সমিতি গঠনের লক্ষ্যে আগামী শুক্রবার বিকেল ৪টায় নিচতলার লবিতে সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক ফ্ল্যাট থেকে মালিক অথবা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধির উপস্থিতি কাম্য।

প্রথম সভার আলোচ্যসূচি ছোট রাখুন:

  1. অন্তর্বর্তী (অ্যাডহক) কমিটি গঠন
  2. গঠনতন্ত্র বা উপবিধি (by-laws) খসড়া করার দায়িত্ব ভাগ
  3. আপাতত মাসিক সার্ভিস চার্জের একটি অস্থায়ী হার
  4. ডেভেলপারের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য একটি উপ-কমিটি

সভার কার্যবিবরণী (minutes) লিখে উপস্থিত সবার সই নিন। পরে বিতর্ক হলে এই কাগজই প্রমাণ।

অ্যাডহক কমিটি: কে কোন দায়িত্বে

ছোট ভবনে তিন থেকে পাঁচজনের কমিটিই যথেষ্ট। অন্তত এই তিনটি পদ পরিষ্কার রাখুন:

  • সভাপতি: সভা পরিচালনা, ডেভেলপার ও বাইরের পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ
  • সাধারণ সম্পাদক: নোটিশ, কার্যবিবরণী, কাগজপত্র সংরক্ষণ
  • কোষাধ্যক্ষ: টাকা আদায়, রসিদ, খরচের হিসাব, ব্যাংক

অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ শুরুতেই লিখে ফেলুন, যেমন ছয় মাস। এর মধ্যে গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করে নিয়মিত কমিটি নির্বাচন করবেন।

প্রথম ৯০ দিনের ১০টি কাজের চেকলিস্ট

ক্রম কাজ দায়িত্ব
১ সব ফ্ল্যাট, মালিক ও বাসিন্দার তালিকা (নাম, মোবাইল, ভাড়াটিয়া কি না) সম্পাদক
২ সমিতির নামে ব্যাংক হিসাব, দুজনের যৌথ সইয়ে কোষাধ্যক্ষ
৩ অস্থায়ী সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ ও প্রথম বিল কমিটি
৪ দারোয়ান, ক্লিনার, লিফট অপারেটরের নিয়োগ ও বেতন ঠিক করা সভাপতি
৫ লিফট, জেনারেটর, পাম্পের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি দেখা উপ-কমিটি
৬ ডেভেলপারের কাছ থেকে কাগজপত্র ও যন্ত্রপাতি বুঝে নেওয়া উপ-কমিটি
৭ কমন বিদ্যুৎ ও পানির মিটার কার নামে, তা যাচাই কোষাধ্যক্ষ
৮ গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি ও সবার মতামত সম্পাদক
৯ রিজার্ভ ফান্ডের জন্য আলাদা হিসাব খোলা কোষাধ্যক্ষ
১০ প্রথম মাসিক হিসাব সবার সামনে প্রকাশ কোষাধ্যক্ষ

টাকার হিসাব শুরু থেকেই পরিষ্কার রাখুন

নতুন সমিতিতে সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস তৈরি হয় টাকা নিয়ে। তাই প্রথম দিন থেকেই কয়েকটি নিয়ম মানুন:

  • নগদ টাকা নিলেও নম্বরসহ রসিদ দিন
  • কোনো খরচ ভাউচার বা বিল ছাড়া করবেন না
  • এক ব্যক্তির কাছে বড় অঙ্কের নগদ জমিয়ে রাখবেন না; নিয়মিত ব্যাংকে জমা দিন
  • প্রতি মাসে আয়-ব্যয়ের সংক্ষিপ্ত হিসাব নোটিশ বোর্ডে টাঙান

ধরুন ২৪ ফ্ল্যাটের একটি ভবনে মাসিক খরচ ৳৭২,০০০। প্রতিটি ফ্ল্যাট সমান ভাগে দিলে ৳৩,০০০ করে আসে। আকার অনুযায়ী ভাগ করবেন নাকি সমান — সেটি প্রথম সভায়ই খোলাখুলি আলোচনা করে লিখিত সিদ্ধান্ত নিন।

পরামর্শ: অস্থায়ী হার ঠিক করার সময় বলে দিন যে ছয় মাস পর প্রকৃত খরচ দেখে হার পুনর্বিবেচনা হবে। এতে শুরুতে আপত্তি কমে।

গঠনতন্ত্রে অন্তত যা লিখে রাখবেন

অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমিতি গঠন করার পর গঠনতন্ত্র বা উপবিধিই হবে সব সিদ্ধান্তের ভিত্তি। খসড়া করার সময় অন্তত এই বিষয়গুলো পরিষ্কার রাখুন:

  • সদস্য কে — প্রতিটি ফ্ল্যাটের মালিক, এবং একাধিক মালিক থাকলে কে ভোট দেবেন
  • কমিটির পদ, মেয়াদ ও নির্বাচনের পদ্ধতি
  • সাধারণ সভা কতদিন পরপর, নোটিশ কতদিন আগে, কোরাম কত
  • সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ ও পরিবর্তনের নিয়ম
  • দেরিতে পরিশোধ করলে কী হবে
  • রিজার্ভ ফান্ড কোন কাজে খরচ করা যাবে, কে অনুমোদন দেবেন
  • ভাড়াটিয়া থাকলে মালিকের দায়িত্ব
  • হিসাব নিরীক্ষা ও বার্ষিক প্রতিবেদন

খসড়া সব মালিকের কাছে পাঠিয়ে অন্তত দুই সপ্তাহ মতামত দেওয়ার সময় দিন। তারপর সাধারণ সভায় পাস করুন। নিবন্ধন বা আইনি কোনো ধাপ প্রযোজ্য কি না, তা আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নিন।

যে ভুলগুলো এড়াবেন

  • শুধু কয়েকজন সক্রিয় মালিক মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাকিদের জানানো
  • ডেভেলপারের দেওয়া পুরোনো খাতা যাচাই না করেই মেনে নেওয়া
  • ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে সরাসরি টাকা নেওয়া, অথচ মালিককে না জানানো
  • গঠনতন্ত্র ছাড়া বছরের পর বছর অ্যাডহক কমিটি চালিয়ে যাওয়া

আপনার সংগঠন যদি সঞ্চয়-ঋণভিত্তিক সমবায় হয়, তাহলে সমিতি কিপার দেখে নিন — সদস্য, সঞ্চয়, লোন ও কিস্তির পুরো হিসাব এক জায়গায়। আর অল্প সদস্যের সমিতির জন্য আছে ছোট সমিতির হিসাব রাখার অ্যাপ — সমিতি কিপার লাইট।

Society Keeper দিয়ে শুরু থেকেই গোছানো রাখুন

নতুন সমিতির জন্য Society Keeper-এ ফ্ল্যাট, মালিক ও বাসিন্দার তালিকা Excel থেকে একবারে তোলা যায়, প্রতি মাসের সার্ভিস চার্জ নির্দিষ্ট দিনে নিজে থেকেই বিল হয়, আর প্রতিটি পেমেন্টে QR কোডসহ নম্বরযুক্ত রসিদ ও SMS যায়। হিসাবের রিপোর্ট সহজে সবার সঙ্গে শেয়ার করা যায় বলে শুরু থেকেই আস্থা তৈরি হয়। দেখতে চাইলে ফ্রি ডেমো নিয়ে দেখুন।

#মালিক সমিতি #অ্যাপার্টমেন্ট #কমিটি গঠন #সার্ভিস চার্জ #গঠনতন্ত্র